
এম. এ আরিফ চৌধুরী স্টাফ রিপোর্টার:-
সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সত্য প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করে একটি নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেস ক্লাব (B.C.P.C)। সংগঠনটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, দেশে প্রতিনিয়ত সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হামলা, মিথ্যা মামলা, হুমকি, হয়রানি ও নানা ধরনের চাপের শিকার হচ্ছেন—যা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বড় বাধা এবং গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি (রোববার) সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খান সেলিম রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহিদুল হাসান সরকার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেন। তাদের নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন রাষ্ট্র ও সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে শারীরিক হামলা, মিথ্যা মামলা, ক্যামেরা ভাঙচুর, মানসিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, সত্য প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক যেন হয়রানির শিকার না হন—এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক, মানবিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের, সংবাদ সংগ্রহে বাধা প্রদান, শারীরিক হামলা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এসব ঘটনার ফলে একদিকে যেমন সংবাদকর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের তথ্য জানার মৌলিক অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমই জনগণের কণ্ঠস্বর। সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ না থাকলে দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাস, দখলবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের গতিও মন্থর হয়ে যায়। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটি মনে করে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না হলে এ ধরনের ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে এবং একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তা, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আহত বা নির্যাতনের শিকার সাংবাদিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
বিসিপিসি নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, ন্যূনতম নিরাপত্তা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। কিন্তু অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের চাপে তাদের সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়, এমনকি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পেশাগতভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সাংবাদিকবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা, তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পৃথক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সব মহলকে সাংবাদিকদের প্রতি সহনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, সাংবাদিক নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হলে তা শুধু সাংবাদিক সমাজের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনবে। কারণ স্বাধীন ও নিরাপদ সাংবাদিকতা মানেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং উন্নয়নের পথ সুগম হওয়া। একটি সত্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সত্য প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। আর সেই পরিবেশ তৈরি করতে হলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে।
বিসিপিসি আশা প্রকাশ করে যে, বর্তমান সরকার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং দেশের সব পর্যায়ে একটি নিরাপদ সাংবাদিকতা পরিবেশ গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের এই ন্যায়সঙ্গত দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটি স্পষ্টভাবে জানায়—“সাংবাদিক নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশ” শুধু একটি দাবি নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য শর্ত। সাংবাদিকরা নিরাপদ থাকলে সত্য নিরাপদ থাকবে, আর সত্য নিরাপদ থাকলে দেশ এগিয়ে যাবে উন্নয়ন, সুশাসন ও ন্যায়বিচারের পথে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন পর্যন্ত সকলের সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ—যেখানে কলম থামবে না, সত্য চাপা পড়বে না, এবং সাংবাদিকরা নির্ভয়ে মানুষের কথা বলতে পারবেন। নিরাপদ সাংবাদিকতা মানেই শক্তিশালী গণতন্ত্র; আর শক্তিশালী গণতন্ত্রই একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি।