আওরঙ্গজেব কামাল,
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে “মব ভায়োলেন্স” বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণপিটুনি, দলবদ্ধ হামলা, গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের মাধ্যমে সংঘটিত এসব ঘটনা এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও পর্যবেক্ষক মহলের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে সারাদেশে একাধিক মব সহিংসতার ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এপ্রিল মাসেই সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। এর আগে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসেও একই ধরনের সহিংসতার ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ঘটনার পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত গুজব, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়, এরপর তাকে “অপরাধী”, “দুর্নীতিবাজ” বা “রাষ্ট্রবিরোধী” আখ্যা দিয়ে জনরোষ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে উত্তেজিত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হামলা, মারধর এমনকি প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব সহিংসতার শিকার কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তি নন; শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষও এর শিকার হচ্ছেন। এতে সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল হলে এবং রাজনৈতিক বিভাজন বাড়লে “মব সংস্কৃতি” শক্তিশালী হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, “জনরোষ” শব্দ ব্যবহার করে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে আইনের শাসনের পরিবর্তে গোষ্ঠীগত শক্তি প্রাধান্য পেতে পারে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনাকে সামগ্রিকভাবে সামাজিক অস্থিরতার অংশ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ,
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা,
বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা,
এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর অবস্থান গ্রহণ।
তাদের মতে, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি আইনের শাসন, ভিন্নমতের নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। কোনো গুজব বা রাজনৈতিক প্ররোচনায় নাগরিক জীবন বিপন্ন হলে তা রাষ্ট্রের জন্য গভীর সংকেত বহন করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেন, মব ভায়োলেন্স যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।
রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষকেই একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, আইনের শাসন নিশ্চিত করাই একমাত্র পথ, যাতে “মব সংস্কৃতি” প্রতিরোধ করা যায়।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: খান সেলিম রহমান
মোবাইলঃ 01712608880
ইমেইলঃ khansalimrahman@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Bangladesh CentralPress Club