বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নেতা আছেন, যাঁদের প্রভাব তাঁদের জীবদ্দশার গণ্ডি অতিক্রম করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আলোচিত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর শাহাদাতের চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, উন্নয়ন ভাবনা এবং জাতীয় পরিচয়বিষয়ক আলোচনায় তাঁর নাম আজও সমানভাবে উচ্চারিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? কী কারণে একজন নেতা মৃত্যুর এত বছর পরও প্রাসঙ্গিক থাকেন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের এক সংকটময় সময়ে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্যে পথ খুঁজছিল। এমন বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটে একজন সংগঠক, রাষ্ট্রনায়ক এবং পরিবর্তনের বার্তাবাহক হিসেবে। তিনি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বই নেননি, বরং জাতিকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।
জিয়াউর রহমানের প্রাসঙ্গিকতার প্রথম ভিত্তি তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন একজন সাহসী সামরিক কর্মকর্তা, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে সাহস ও প্রত্যয়ের সঞ্চার করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব এবং বীরত্ব তাঁকে জাতীয় ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তাঁর অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা শুধু মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তিও জরুরি। ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়াইকে তিনি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর শাসনামলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জিয়ার উন্নয়ন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামমুখিতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের প্রাণ গ্রামে এবং দেশের উন্নয়নও গ্রাম থেকেই শুরু হতে হবে। কৃষি, সেচ, অবকাঠামো এবং স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আজ যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়, তখন তাঁর অনেক উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় অবদান বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পরিসর যখন সংকুচিত হয়ে পড়েছিল, তখন তিনি রাজনৈতিক দল গঠন, মতপ্রকাশ এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করেন। তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও আদর্শের মানুষের অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
গণতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অংশগ্রহণমূলক। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামত এবং অংশগ্রহণের বিকল্প নেই। সেই কারণেই তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ এবং জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর মতে, জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হলে দেশের মানুষকে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রিক চেতনার মধ্যে আবদ্ধ করতে হবে। এই দর্শন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করে, যা আজও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে বিদ্যমান।
পররাষ্ট্রনীতিতেও তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন মাত্রা দেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
জিয়ার নেতৃত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর কর্মমুখী মনোভাব। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা অর্জন করতে হয়। তাঁর শাসনামলে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। “উৎপাদনমুখী রাজনীতি” ধারণাটি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন সাদাসিধে এবং কর্মনিষ্ঠ। ক্ষমতার চাকচিক্যের চেয়ে কাজকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ যোগাযোগ এবং বাস্তবমুখী নেতৃত্বের কারণে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও সাধারণত তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও দেশপ্রেমের প্রশংসা করে থাকেন।
শহীদ জিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সম্ভাবনার প্রতি তাঁর আস্থা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের মানুষ যদি সুযোগ পায়, তাহলে তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই বদলে দিতে পারবে। এই আত্মবিশ্বাস তিনি জাতির মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিভিন্ন কর্মসূচি এবং বক্তব্যে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়।
আজকের বাংলাদেশে যখন গণতন্ত্র, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন সামনে আসে, তখন অনেকেই জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্বের ধরণকে নতুন করে মূল্যায়ন করেন। কারণ তিনি এমন একটি সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যখন দেশকে একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজতে হয়েছিল।
চার দশকের বেশি সময় পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। তাঁর প্রবর্ত
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: খান সেলিম রহমান
মোবাইলঃ 01712608880
ইমেইলঃ khansalimrahman@gmail.com
© All rights reserved © 2023 Bangladesh CentralPress Club